স্টক নিউজ বিডি অনলাইন ডেস্ক: সফররত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেটকে বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে নানা ‘অপপ্রচার’ সম্পর্কে জানিয়েছেন সরকার, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনেরা।
মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ব্যাচেলেটের সম্মানে এক মতবিনিময় ও নৈশভোজে বিশিষ্টজনরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
এতে অংশ নেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট ডিকসন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস, মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা হাশিম, ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত হার্তান্তো সুবোলো, সাবেক রাষ্ট্রদূত শমসের মবিন চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, নারী নেত্রী আরোমা দত্ত, রোকেয়া কবির, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মফিদুল হক, রাষ্ট্রদূত আব্দুল হান্নান, রাষ্ট্রদূত শামীম আহসান, শিফা হাফিজা, প্রফেসর সাহাব আনাম খান প্রমুখ।
পররাষ্ট্র সচিব ড. মাসুদ বিন মোমেনের সঞ্চালনায় মতবিনিময় পর্বে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বে একটা মর্যাদার স্থানে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও বাংলাদেশ মোটামুটি একই রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যাচ্ছে।
ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে জামিন না দেওয়া, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, সাংবাদিকদের এই আইনের বাইরে রাখা, এই আইনে প্রকৃত সাংবাদিকরা গ্রেফতার হচ্ছে কি না- এসব বিষয়ের সাংবিধানিক ও আইনি ব্যাখ্যা দেন ড. সেলিম মাহমুদ।
তিনি জানান, দেশে প্রচলিত বেশ কয়েকটি আইনে যৌক্তিক কারণেই বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতারের বিধান রয়েছে, অনেক আইনেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে জামিন না দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে উচ্চতর আদালত জামিন দিয়ে থাকে। সাংবাদিকসহ কোনো কমিউনিটিকে নির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি আইনের আওতার বাইরে রাখা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি।
বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি আইনে বহু বছর ধরেই এই ধরনের বিধান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, যৌক্তিক কারণেই এই ধরনের বিধান রাখা হয়। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সনদ, আমাদের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের বিধানাবলী এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ড. সেলিম মাহমুদ জানান, এই বিষয়টি পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে, যে মামলাগুলো ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের আওতায় বলে প্রচার করা হচ্ছে, এর প্রায় ৮০ শতাংশ মামলা বিএনপির আমলে প্রণীত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার অধীন মামলা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এই ৫৭ ধারা বাতিল করেছে। আর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে মামলার কথা বলা হচ্ছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশ মামলাই হচ্ছে অনলাইন ভিত্তিক কিছু ভূইফোঁড় বেআইনি নিউজ পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, যারা মূলত নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে হয়রানি করে থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে যে অপপ্রচার চলছে, সেই বিষয়টি ড. সেলিম মাহমুদ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দৃষ্টিতে আনেন। তিনি জানান, মানবাধিকার রিপোর্টগুলোতে গুম সম্পর্কিত যে তথ্য দেওয়া হয়ে থাকে, একটু পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায় যে, এগুলো স্ববিরোধী ও বাস্তবতাবিবর্জিত। এসব রিপোর্টে বলা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এই জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার মূল ভিকটিম। কিন্তু সেই রিপোর্টে ভিকটিমদের যে সংখ্যা দেওয়া হয়, তাতে বোঝা যায় এই বক্তব্য স্ববিরোধী ও বাস্তবতাবিবর্জিত। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ভিকটিম রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী সমর্থক হয়ে থাকলে এই সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কথা। পক্ষান্তরে ভিকটিমদের যে তালিকা দেওয়া হয়, সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য কিংবা সমর্থক থাকে না।
ড. সেলিম মাহমুদ আরও জানান, তাতে বোঝা যায়, এই রিপোর্টগুলোতে যে তথ্য দেওয়া হয়, সেগুলো অসত্য ও স্ববিরোধী। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে নানা কারণে কিছু ব্যক্তি প্রতিবছর নিখোঁজ হয়ে যায়। দেশের মোট জনসংখ্যার আকার বিবেচনা করলে নিখোঁজ হওয়া এই মানুষের সংখ্যাও কম হওয়ার কথা নয়। মূলত এই হারিয়ে যাওয়া লোকগুলোকেই এই তালিকায় আনা হয়ে থাকে।
আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জাতিসংঘের হাইকমিশনারকে জানান, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কিছু মানবাধিকার সংগঠন সাম্প্রতিক সময়ে যে রিপোর্ট প্রকাশ করছে, তাতে দেখা যায় এই সংগঠনগুলো যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করছে, সেগুলো সরকারবিরোধী কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে নেওয়া। কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পক্ষপাত দোষে দুষ্ট কোনো সোর্স থেকে তথ্য নেওয়া সমীচীন নয়। এসব সংগঠনের রিপোর্টে যে ফুটনোট ব্যবহার করা হয়, তাতে দেখা যায় তারা কেবল সরকারবিরোধী সোর্স থেকে তথ্য নিচ্ছে। এই ধরনের পক্ষপাত দুষ্ট ও একপেশে রিপোর্ট সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের রিপোর্টের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। এই ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্বের দেশে দেশে মানবাধিকার সংরক্ষণে কী ভূমিকা রাখে, এটি সেসব সংগঠনই ভালো বলতে পারবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্বের সব দেশের মানবাধিকার নিয়েই সমস্যা রয়েছে। আমি অনেক শক্তিশালী ও ধনী রাষ্ট্র দেখেছি, যাদের মানবাধিকার নিয়ে অনেক সমস্যা রয়েছে। এক একটি দেশের পরিস্থিতি একেক রকমের, মানবাধিকার নিয়ে প্রতিটি দেশের অনেক কাজ করার আছে।
স্টক নিউজ বিডি.কম/এসএম
আরও পড়তে পারেন…
