প্রতিবেদন: নিজস্ব প্রতিনিধি: বাংলাদেশের নৌবাণিজ্যে নতুন এক অধ্যায় সূচিত হলো। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-এর বহরে যুক্ত হলো আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নতুন জাহাজ ‘এমভি বাংলার প্রগতি’। চীনের Jingjiang Nanyang Shipbuilding Co., Ltd. শিপইয়ার্ডে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর (বাংলাদেশ সময় সকাল ১১:৩০ মিনিটে) আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটির ডেলিভারি গ্রহণ করা হয়।
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, সচিব, প্রকল্প পরিচালক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা। এছাড়াও ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি, বায়ার সুপারভাইজার, জাহাজের মাস্টার, চীফ ইঞ্জিনিয়ার এবং নাবিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ডেলিভারি সম্পন্ন হওয়ার পরপরই জাহাজটিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে শিপইয়ার্ড থেকে একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ‘Maiden Voyage’-এর জন্য প্রয়োজনীয় সব সার্টিফিকেশন ও পরিদর্শন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
পরবর্তীতে ২৬ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ‘এমভি বাংলার প্রগতি’ প্রতিদিন গড়ে ২০,০০০ মার্কিন ডলার হারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য পরিবহনে অংশ নিচ্ছে। জাহাজটি ইতোমধ্যে অগ্রিমসহ প্রায় ৪,৬৭,০০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৫ কোটি ৭২ লক্ষ টাকারও বেশি) আয় করেছে — যা বিএসসির নিজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন বলে বিবেচিত হচ্ছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিএসসি নিজস্ব অর্থায়নে দুটি আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ (প্রতিটি ৫৫,০০০–৬৬,০০০ ডিডব্লিউটি) সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সুপারিশে অনুমোদনের পর ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে বিএসসি ও Hellenic Dry Bulk Ventures LLC-এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদিত হয় ৩ জুন ২০২৫ তারিখে, যার মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ১,১৬,২৯৬.২৪ লক্ষ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি জাহাজের মূল্য ৩৮.৩৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৪.৬০৭ শতাংশ কম।
এটি প্রমাণ করে যে বিএসসি কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে একটি সাশ্রয়ী এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জাহাজ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে।
চুক্তি অনুযায়ী ক্রয়কৃত দুটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে —
এমভি বাংলার প্রগতি (পূর্ব নাম: XCL GEMINI)
এমভি বাংলার নবযাত্রা (পূর্ব নাম: XCL LION)
এমভি বাংলার প্রগতি জাহাজটি আধুনিক Green Ship Concept-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। এতে রয়েছে এমন প্রযুক্তিগত সমাধান যা জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক IMO Tier-III মানদণ্ড অনুসারে নির্মিত। সব মিলিয়ে, ‘এমভি বাংলার প্রগতি’ একটি পরিবেশসম্মত, শক্তি-সাশ্রয়ী ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক জাহাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাহাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিএসসির বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ নাবিক, ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল ক্রুদের। বিএসসির বিশেষায়িত মনিটরিং সেল সার্বক্ষণিকভাবে জাহাজের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। এছাড়া পণ্য পরিবহনের জন্য নিরাপদ ও লাভজনক রুট নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।সম্ভাবনা রয়েছে, নভেম্বর ২০২৫-এর শেষ সপ্তাহে জাহাজটি বাংলাদেশে পৌঁছাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় জাহাজ ‘এমভি বাংলার নবযাত্রা’ ডিসেম্বর ২০২৫-এ বিএসসির কাছে হস্তান্তর করা হবে। দুটি জাহাজ বহরে যুক্ত হলে বিএসসির নিজস্ব পরিবহন সক্ষমতা ১,২০,০০০ ডিডব্লিউটি-তে উন্নীত হবে।এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবহন খাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
বিএসসির কর্মকর্তারা মনে করেন, এই দুটি নতুন জাহাজ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের সক্ষমতা বহুগুণে বাড়াবে।
এর ফলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।
বিএসসির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “এমভি বাংলার প্রগতি শুধু একটি জাহাজ নয়, এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতার প্রতীক। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও আধুনিক নকশায় নির্মিত এই জাহাজ ভবিষ্যতের ‘সবুজ নৌবাণিজ্য’-এর পথ দেখাবে।” বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের নতুন সংযোজন ‘এমভি বাংলার প্রগতি’ দেশীয় নৌপরিবহনে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে উঠছে।
পরিবেশবান্ধব, কারিগরি উন্নত ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক এই জাহাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে এবং এক নতুন ‘সামুদ্রিক সমৃদ্ধির যুগ’-এর সূচনা করবে।
