নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান পুঁজিবাজারে আস্থা পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর সীমান্ত বাজার থেকে একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ-নির্ভর উদীয়মান বাজারে রূপান্তর করাই নতুন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।
চেয়ারম্যান বলেন, গত কয়েক বছরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে এবং অনেক ভালো কোম্পানি বাজারে আসতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুঁজিবাজারের বিকাশ ঘটেনি।
তিনি জানান, কমিশন “স্মার্ট রেগুলেশন” বা আরও কার্যকর ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলবে। অপ্রয়োজনীয় রিপোর্টিং, অনুমোদন ও কমপ্লায়েন্স ব্যয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতাও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
পুঁজিবাজারের ডিজিটাল রূপান্তরকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইপিও, রাইটস ইস্যু, বন্ড, সুকুক, লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রক দাখিলপত্রসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হবে।
বাজারে ভালো মানের সিকিউরিটিজের ঘাটতি দূর করতে বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে একটি কার্যকর ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো চালুর কথাও জানান তিনি।
চেয়ারম্যান বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয়ে “লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম” চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর আওতায় কর সুবিধা, দ্রুত অনুমোদন এবং সহজতর মূলধন সংগ্রহের সুযোগ থাকতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা কোম্পানি, প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের ভূমিকা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তথ্য প্রকাশের মান উন্নয়ন, সুশাসন জোরদার এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারে প্রবেশ ও মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান চেয়ারম্যান।
বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প স্কিম এবং অন্যান্য কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং সিডিবিএলকে সমন্বিত করে আধুনিক রিয়েল-টাইম নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, কমিশনের লক্ষ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ন্যায্য মূল্য আবিষ্কার ও তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। “মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার, কারসাজি নয়”—উল্লেখ করেন তিনি।
বিনিয়োগকারী সুরক্ষাকে কমিশনের কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, তথ্য প্রকাশের মান উন্নয়ন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কোনো স্থায়ী বাজারব্যবস্থা হতে পারে না এবং ভবিষ্যতে নতুন করে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না; বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে চেয়ারম্যান বলেন, নতুন কমিশনের মূল লক্ষ্য হলো পুঁজিবাজারে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, “আস্থা আসে ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহিতা থেকে। আমরা এমন একটি পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে চাই, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ন্যায়সঙ্গত, ইস্যুকারীদের জন্য আকর্ষণীয় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য।


