শুরুতে কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, পতন ঠেকাতে ফ্লোর প্রাইস, শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরানোসহ নানা পদক্ষেপ নেয় বিএসইসি। এসব খবরে আশা জেগেছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে”।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ একটানা ৯ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০২০ সালের মে মাসে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন এম খায়রুল হোসেন। ওই মাসেই ২০২০ সালের ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। ৪ বছরের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি। চুক্তি অনুযায়ী ১৬ই মে ২০২৪ তার মেয়াদ শেষ হয়।
তবে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে যুগ্ম সচিব মো. জাহিদ হোসেন সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ এর ধারা ৫ (৬) মোতাবেক ২০২৪ সালের ১৭ই মে থেকে অথবা যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী চার বছর মেয়াদের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান পদে পুনঃনিয়োগ করা হয়।
২০২০ সালের ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। দায়িত্ব নেওয়ার ১৩ দিনের মাথায় ২০২০ সালের ৩১ মে শেয়ারবাজারের বন্ধ লেনদেন চালু করেন।খায়রুল হোসেনের বিদায়ের পর আশায় বুক বেঁধেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। শুরুতে তাই শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম যে উদ্যোগই নিয়েছেন, বিনিয়োগকারীরা তাতে সমর্থন দিয়েছেন।
কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
শুরুর কয়েক মাস শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত কমিশন কারসাজির বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক নানা ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয় কারসাজির সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারী, কোম্পানির উদ্যোক্তা, ব্রোকারেজ হাউসের মালিক ও নির্বাহীদের বিরুদ্ধেও। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করে। শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম কমিশনের প্রথম দেড় বছরের নানা উদ্যোগের ফলে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর ৭ হাজার ৩৬৮ পয়েন্টের রেকর্ড উচ্চতায় উঠে যায়। এ সময়ের মধ্যে ঢাকার বাজারের লেনদেনও তিন হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
গত চার বছরে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পাশাপাশি জড়িত ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে চিহ্নিত করে যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে আইপিও কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একইসঙ্গে যেসব ব্যক্তি এসব কারসাজির সঙ্গে জড়িত তাদেরকে জরিমানার আওতায় নিয়ে আসা হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান (ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক) কারসাজির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের সনদ নবায়ন স্থগিত করাসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়।
কারসাজি বন্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। ন্যূনতম শেয়ারধারণের শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তাদের সরিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। একের পর এক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয় রোড শো।
পতন ঠেকাতে ফ্লোর প্রাইস
শেয়ারবাজারে প্রথম ফ্লোর প্রাইস বা শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়ার অভিনব এক ব্যবস্থা চালু হয়েছিল খায়রুল হোসেনের আমলে, ২০২০ সালের মার্চে। ঢাকার বাজারের সূচক সাড়ে ৩ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে এলে পতন ঠেকাতে এ ব্যবস্থা নিয়েছিল তৎকালীন কমিশন। ২০২১ সালের শুরুতে বাজারে গতি ফিরে এলে সেই ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়।
এর পর শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা লাগে শেয়ারবাজারেও। ফলে শুরুর সাফল্য শেষ দুই বছরে ম্লান হয়ে যায়। যেসব উদ্যোগ নিয়ে তিনি মেয়াদের শুরুতে সফলতা পেয়েছিলেন, সেসব উদ্যোগের বেশির ভাগ পরবর্তী সময়ে শেয়ারবাজারে কারসাজির বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আর সেসব কারসাজির কারণেই বাজার এখন ধুঁকছে।
কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বাজারে আবারও পতন শুরু হয়। সেই পতন ঠেকাতে ২০২২ সালের জুলাইয়ে শেয়ারবাজারে আবারও ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনে শিবলী কমিশন। সেই ফ্লোর প্রাইস অব্যাহত ছিল দেড় বছরের বেশি সময়। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হয় ফ্লোর প্রাইস।
বন্ধ কোম্পানি চালুর উদ্যোগে এক অনন্য রেকর্ড
২০২০ সালের ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারের প্রায় অর্ধশত লোকসানি ও বন্ধ কোম্পানির পর্ষদ বদলে কোম্পানিগুলোকে লাভজনকভাবে চালানোর উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। এর মধ্যে কিছু কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে নতুন করে স্বতন্ত্র পর্ষদ নিয়োগ করা হয়। আর কিছু কোম্পানির মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্বই বদলে দেওয়া হয়। যা শেয়ারবাজারে এক অনন্য রেকর্ড হয়ে থাকে।
শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরানোই চ্যালেঞ্জ
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে আবার শুরু হয় ভয়াবহ দরপতন। শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক ভয়াবহ দরপতনের জন্য আস্থার সংকটকেই বড় কারণ মনে করা হচ্ছে। কারসাজির ভয়, সুশাসনের ঘাটতিসহ নানা কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার অংশীজনদের মধ্যেও এ সংকট তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে পতন ঠেকাতে শেয়ারের দাম কমার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা কমিশনকে জানিয়েছে ডিএসইর পর্ষদ। আর ফ্লোর প্রাইসের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বিমুখ হয়ে পড়েছেন। ফলে পুনর্নিয়োগ পাওয়া শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো।
শেয়ারবাজারের পরিস্থিতি
গত সপ্তাহের সব কার্যদিবসেই টানা পতনে ছিলো ঢাকা স্টক এক্সেচেঞ্জ (ডিএসই)। গতকাল রবিবার ২৬/০৫/২০২৪ দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূল্যসূচকের পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। কমেছে ৩২২ কোম্পানির শেয়ারদর। গত কার্যদিবসের তুলনায় কমেছে লেনদেন।
ডিএসইর প্রধান সূচক ‘ডিএসইএক্স’ ৬১ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট কমেছে। বর্তমানে সূচকটি অবস্থান করছে ৫ হাজার ২৫০ পয়েন্টে। ডিএসইর অপর সূচক ‘ডিএসইএস’১৩ দশমিক ০৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৪৬ পয়েন্ট এবং ‘ডিএস-৩০’ সূচক ১৮ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৮৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
ডিএসইতে ৩২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। ডিএসইতে মোট ৩৮২টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ৩১ টি কোম্পানির, বিপরীতে ৩২২টি কোম্পানির দর কমেছে। পাশাপাশি ২৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
আজকের লেনদেন
৯ কার্যদিবস পর সূচকের উত্থানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শেষ হয়েছে। বেড়েছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর। গত কার্যদিবসের তুলনায় বেড়েছে লেনদেনও।
এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ‘ডিএসইএক্স’ ৫৯ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট বেড়েছে। বর্তমানে সূচকটি অবস্থান করছে ৫ হাজার ৩১০ পয়েন্টে।এছাড়াও, ডিএসইর অপর সূচক ‘ডিএসইএস’১৩ দশমিক ৭০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৬০ পয়েন্ট এবং ‘ডিএস-৩০’ সূচক ১১ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯০০ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
আজ ডিএসইতে ৫০৬ কোটি ১১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে ৩২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
আজ ডিএসইতে মোট ৩৯৪টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ২৭৬ টি কোম্পানির, বিপরীতে ৮৪টি কোম্পানির দর কমেছে। পাশাপাশি ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর অপরিবর্তিত রয়েছে। —এ নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে বিনিয়োগকারীদের মনে
স্টক নিউজ বিডি/ শামীম রেজা
