বিশেষ প্রতিবেদন:
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার আন্দোলন সংঘটিত হয়। স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের গুলিতে ঢাকার রাজপথ যখন রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন সেই রক্তপাতের খবর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের ভেতরের এই নির্মমতার বিরুদ্ধে পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা গড়ে তোলেন এক অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী প্রতিরোধ দেয়াল।
বিশ্বজুড়ে প্রবাসীদের গর্জন ও সমাবেশ
বাংলাদেশের ছাত্রদের ওপর নির্মম নির্যাতনের প্রতিবাদে প্রবাসীরা রাজপথে নেমে আসেন। ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
- ফ্রান্সের প্রতিরোধ: প্যারিসের ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বর (Place de la République), বাস্তিল চত্বর (Place de la Bastille) এবং বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার চত্বর প্রবাসীদের স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। তাঁরা ব্যানার, ফেস্টুন ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পদত্যাগ এবং গণহত্যার বিচার দাবি করেন।
- বৈশ্বিক সংহতি: একইভাবে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ার, টরন্টো, রিয়াদ এবং দুবাইয়ের রাস্তায় হাজার হাজার বাঙালি প্রবাসী একত্রিত হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তারা বিশ্ববাসীর কাছে শেখ হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।
অর্থনৈতিক ধাক্কা: ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্য ও রেমিট্যান্স শাটডাউন
এই আন্দোলনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট ছিল প্রবাসীদের অর্থনৈতিক প্রতিরোধ। ফ্রান্স প্রবাসী বিশিষ্ট লেখক, চিন্তক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীদের প্রতি এক বৈপ্লবিক আহ্বান জানান। তিনি বৈধ চ্যানেলে বাংলাদেশে টাকা পাঠানো বন্ধ করার জন্য ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ (Remittance Shutdown)-এর ডাক দেন।
এই আহ্বান প্রবাসীদের মাঝে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকার প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে টাকা পাঠানো সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এর ফলে:
- ফ্যাসিস্ট সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তীব্র টান পড়ে।
- ডলার সংকটে পড়ে সরকারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চাকা প্রায় অচল হয়ে যায়।
- আন্তর্জাতিক মহলে স্বৈরাচারী সরকারের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ফ্যাসিবাদী ভিত্তির ভাঙন
বিশ্বব্যাপী প্রবাসীদের এই তীব্র প্রচারণা, রাজপথের বিক্ষোভ এবং ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’-এর যৌথ ধাক্কায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতার ভিত্তি পুরোপুরি নড়ে যায়। প্রবাসী বাঙালিদের এই বীরত্বপূর্ণ অবদান ও প্রচারণা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
