প্রি-আইপিও নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ | শেয়ারের মূল্যায়নে চার পদ্ধতি | আইপিওর অর্থ ব্যবহারে কঠোর নজরদারি | শেয়ার বরাদ্দে স্বয়ংক্রিয় লটারির প্রস্তাব
বিশেষ প্রতিবেদন: দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) নিয়মকানুনে ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে নির্দিষ্ট শর্তে লোকসানি কোম্পানি, মূলধননির্ভর বড় প্রতিষ্ঠান এবং নতুন প্রকল্পভিত্তিক কোম্পানির জন্যও পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আইপিওর আগে কোম্পানির আর্থিক তথ্য যাচাই, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ, উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বণ্টনের প্রক্রিয়ায় আসতে পারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
এ লক্ষ্যে ২০২৫ সালের বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) বিধিমালা সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। খসড়ার ওপর জনমত, পরামর্শ ও আপত্তি আহ্বান করা হয়েছে। ১৮ অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হিসেবে আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে লোকসানি কোম্পানিকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ, উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির নতুন ব্যবস্থা এবং তালিকাভুক্তির পর শেয়ার বিক্রির বিধান শিথিল করার প্রস্তাব বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার প্রশ্নেও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।
আইপিওর আগে স্বাধীন নিরীক্ষা, যাচাই হবে ১৫টি ক্ষেত্র
প্রস্তাবিত বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, আইপিওর আবেদন জমা দেওয়ার আগে কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রি-আইপিও ভেরিফিকেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বিএসইসির নির্ধারিত প্যানেল থেকে নিয়োগ করা নিরীক্ষক এ যাচাই করবেন।
এ ক্ষেত্রে শুধু নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী পরীক্ষা করেই দায়িত্ব শেষ হবে না। কোম্পানির প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্যের সত্যতা, যথার্থতা ও পূর্ণতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দলিলপত্রও পর্যালোচনা করতে হবে। যাচাইয়ের প্রতিবেদন প্রসপেক্টাসে সংযুক্ত করা এবং নিরীক্ষকের স্বাক্ষরযুক্ত নির্ধারিত ঘোষণাপত্র আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় যাচাইয়ের জন্য ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
• আর্থিক বিবরণী, বিক্রয় ও রাজস্বের সত্যতা;
• পাওনা, দেনা, মজুত পণ্য ও স্থায়ী সম্পদের অস্তিত্ব;
• নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব, ঋণ ও অন্যান্য দায়;
• সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন;
• কর, ভ্যাট ও আইনি বাধ্যবাধকতা;
• উদ্যোক্তা, পরিচালক ও শেয়ার মালিকানার তথ্য;
• প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং প্রসপেক্টাসে প্রকাশিত তথ্যের যথার্থতা।
পাশাপাশি আয় বাড়িয়ে দেখানো, ভুয়া বিক্রয় বা সম্পদ দেখানো, হিসাব সাজিয়ে উপস্থাপন এবং ঋণের অর্থ অনুমোদিত খাতের বাইরে ব্যবহারের মতো সম্ভাব্য অনিয়মও যাচাইয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রয়োজনে নিরীক্ষককে কোম্পানির কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন করতে হবে। চেয়ারম্যান, পরিচালক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও নির্ধারিত যাচাই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে কাগজে-কলমে ভালো আর্থিক অবস্থান দেখিয়ে বাজারে আসার চেষ্টা করা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিরীক্ষার স্বাধীনতা, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।
চার পদ্ধতিতে মূল্যায়ন, প্রকাশ করতে হবে হিসাবের ভিত্তি
আইপিওতে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণেও আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও একাধিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজারকে অন্তত চারটি পদ্ধতিতে শেয়ারের মূল্যায়ন করতে হবে। এর মধ্যে কমপক্ষে দুটি হবে অ্যাবসলিউট বা পরম মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং দুটি হবে রিলেটিভ বা তুলনামূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি।
পরম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (ডিসিএফ), ফ্রি ক্যাশ ফ্লো টু ইক্যুইটি, ফ্রি ক্যাশ ফ্লো টু ফার্ম, রেসিডুয়াল ইনকাম মডেল এবং সম্পদভিত্তিক মূল্যায়নের মতো পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে তুলনামূলক মূল্যায়নে মূল্য-আয় অনুপাত (পি/ই), মূল্য-সম্পদ অনুপাত (পি/বি), মূল্য-নগদ প্রবাহ অনুপাত (পি/সিএফ), এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু টু ইবিআইটিডিএ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু টু বিক্রয় অনুপাত ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কোন পদ্ধতি কেন বেছে নেওয়া হয়েছে, তুলনার জন্য কোন কোম্পানি বা লেনদেন বিবেচনা করা হয়েছে এবং মূল্য নির্ধারণে কী ধরনের অনুমান ব্যবহার করা হয়েছে—তা প্রসপেক্টাসে ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রবৃদ্ধির হার, ডিসকাউন্ট রেট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনুমানের ভিত্তি ও উৎসও প্রকাশ করতে হবে।
রোড শোতে পাওয়া মতামত বিবেচনায় নিয়ে নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করা হবে। সেই মূল্য কেন যৌক্তিক, তা ব্যবহৃত মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার প্রস্তাব রয়েছে।
মূল্য নির্ধারণের এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিনিয়োগকারীরা শুধু প্রস্তাবিত শেয়ারের দাম নয়, কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়, সম্পদ ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনার ভিত্তিও পর্যালোচনা করতে পারবেন। তবে একাধিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করলেই যে শেয়ারের দাম বাস্তবসম্মত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। মূল্যায়নে ব্যবহৃত অনুমান ও তুলনীয় কোম্পানি নির্বাচন কতটা যৌক্তিক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বুক বিল্ডিংয়ে দরপ্রস্তাব ও কাট-অফ প্রাইসে পরিবর্তন
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বা যোগ্য বিনিয়োগকারীদের দরপ্রস্তাব গ্রহণ এবং শেয়ার বরাদ্দের নিয়মেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, যোগ্য বিনিয়োগকারীরা নির্দেশক মূল্য বিবেচনায় শেয়ারের দর এবং চাহিদার পরিমাণ উল্লেখ করে প্রস্তাব দেবেন। নির্ধারিত ন্যূনতম দরসীমার নিচে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে না।
দরপ্রস্তাব গ্রহণ শেষ হলে সর্বোচ্চ দর থেকে সর্বনিম্ন দর পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো সাজানো হবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ করা শেয়ারের চাহিদা পূরণের সীমায় যে দর পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতে কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
যোগ্য বিনিয়োগকারীদের নিজ নিজ দর অনুযায়ী শেয়ার বরাদ্দ করা হবে। সর্বোচ্চ দরদাতাদের দিয়ে শুরু করে বরাদ্দের পরিমাণ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলবে। একই দামে চাহিদা অবশিষ্ট শেয়ারের চেয়ে বেশি হলে আনুপাতিক হারে বরাদ্দের বিধান রাখা হয়েছে।
রোড শো শেষে বিনিয়োগকারী, বিশ্লেষক ও আগ্রহী ব্যক্তিরা তিন কার্যদিবসের মধ্যে মূল্যায়ন ও প্রস্তাবিত দর জমা দিতে পারবেন। স্বীকৃত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অথবা সরাসরি লিখিতভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
রোড শো থেকে পাওয়া মূল্যায়নের সারসংক্ষেপও প্রসপেক্টাসে প্রকাশ করতে হবে। এতে পঞ্চম, ২৫তম, ৭৫তম ও ৯৫তম পার্সেন্টাইলের পাশাপাশি গড় ও মধ্যকের মতো পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
লোকসানি কোম্পানির জন্য বিশেষ ছাড়
প্রস্তাবিত সংশোধনীর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো নির্দিষ্ট শর্তে লোকসানি কোম্পানিকে আইপিওতে আসার সুযোগ দেওয়া।
সাধারণ নিয়মে আইপিওর জন্য কোম্পানির সর্বশেষ অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা থাকতে হবে এবং আবেদন করার সময় কোনো পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা যাবে না। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে এ শর্তে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি, কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা মোট সম্পদ রয়েছে এমন মূলধননিবিড় কোম্পানি এবং গ্রিনফিল্ড বা নতুন প্রকল্পভিত্তিক কোম্পানির ক্ষেত্রে ছাড়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আবেদন এবং স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশন বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবে।
এ ধরনের কোম্পানিকে প্রসপেক্টাসে মুনাফায় পৌঁছানোর বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। সম্ভব হলে তালিকাভুক্তির দুই বছরের মধ্যে লাভজনক হওয়ার লক্ষ্যও পরিকল্পনায় উল্লেখ করতে হবে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানের নিশ্চয়তা-সংক্রান্ত নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসারে প্রি-আইপিও যাচাইকারী নিরীক্ষককে পরিকল্পনাটি পরীক্ষা ও যাচাই করতে হবে।
নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিচালিত প্রকল্পভিত্তিক কোম্পানির ক্ষেত্রেও আইপিওর সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে বর্তমান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে নতুন প্রকল্প গ্রহণ অথবা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট ও নথিভুক্ত পরিকল্পনা থাকতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কোম্পানিও শর্তসাপেক্ষে এ সুযোগের আওতায় আসতে পারে।
এ পরিবর্তনের ফলে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পদনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়তে পারে। এসব প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে বড় বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে লোকসান হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সব লোকসানি কোম্পানির পরিস্থিতি এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের লোকসান যদি দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত ঋণ, বাজার হারানো বা অনিয়মের ফল হয়, তাহলে শুধু ভবিষ্যতে লাভের আশ্বাসের ভিত্তিতে তাকে বাজারে আনার ঝুঁকিও রয়েছে।
লোকসান নয়, আর্থিক অবস্থার সামগ্রিক মূল্যায়ন জরুরি
লোকসানি কোম্পানির আইপিও-যোগ্যতা নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের আলোচনায় আর্থিক অবস্থার সামগ্রিক বিশ্লেষণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমনের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে কোনো কোম্পানির আইপিওতে আসার যোগ্যতা নির্ধারণ করা উচিত নয়। একটি কোম্পানির লোকসান ধারাবাহিকভাবে কমছে কি না, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কি না এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটছে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তার ব্যাখ্যায়, কোনো কোম্পানির লোকসান আগে ১০ টাকা, পরে ৮ টাকা এবং এরপর ৬ টাকায় নেমে এলে প্রতিষ্ঠানটি এখনো লোকসানে থাকলেও তার আর্থিক অবস্থার উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। তবে সেই প্রবণতা টেকসই কি না, তা যাচাই করতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লোকসানকে একমাত্র মানদণ্ড না ধরে কোম্পানির ব্যালান্সশিট, নগদ প্রবাহ, দায়, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, প্রসপেক্টাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা। তবে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থারও নিশ্চিত করতে হবে, প্রকাশিত তথ্য যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য এবং ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আইপিওর আগে মূলধন ও শেয়ার ছাড়ার শর্ত
খসড়ায় সাধারণ কোম্পানির ক্ষেত্রে আইপিওর আগে বিদ্যমান পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণ নিয়মে তালিকাভুক্তির পরের পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার আইপিওর মাধ্যমে ছাড়তে হবে। বিমা কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তির পর পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে আইপিওর আগে নিট সম্পদমূল্য কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা এমন কোম্পানির জন্য শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের কোম্পানি তালিকাভুক্তির পরের পরিশোধিত মূলধনের ৫ শতাংশের কম নয়, তবে ১০ শতাংশের নিচে শেয়ার ছাড়তে পারবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানির ক্ষেত্রে আইপিও ও অফার ফর সেল (ওএফএস) মিলিয়ে শেয়ার ছাড়ার হাইব্রিড পদ্ধতি প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় বিদেশি শেয়ারধারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা রয়েছে এমন কোম্পানি, বিটিআরসিতে নিবন্ধিত নির্দিষ্ট কোম্পানি এবং বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদ ৫০০ কোটি টাকার বেশি এমন কোম্পানি আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট শ্রেণি অনুযায়ী নিট সম্পদমূল্যের শর্তও পূরণ করতে হবে।
প্রস্তাবিত হাইব্রিড পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির পরের পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৫ শতাংশ নতুন শেয়ার হিসেবে ছাড়তে হবে। আইপিও ও ওএফএস মিলিয়ে মোট শেয়ার ছাড়ার পরিমাণ হতে হবে কমপক্ষে ১০ শতাংশ।
এ ক্ষেত্রে নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানিতে নতুন মূলধন প্রবেশের পাশাপাশি উদ্যোক্তা বা বিদ্যমান শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানি যে অর্থ পায়, বিদ্যমান শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির অর্থ সাধারণত তাদের কাছেই যায়। ফলে দুই ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা জরুরি।
তালিকাভুক্তির পর ৩০ কার্যদিবসে ওএফএসের শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব
ওএফএসের মাধ্যমে উদ্যোক্তা, পরিচালক বা বিদ্যমান শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও তদারকির বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে হাইব্রিড আইপিও সম্পন্ন করে জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত শেয়ারের অন্তত ৫ শতাংশের সাবস্ক্রিপশন পাওয়ার পর অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির যোগ্য বিবেচনা করা হবে।
তালিকাভুক্তির প্রথম দিনের জন্য বুক বিল্ডিংয়ে নির্ধারিত কাট-অফ প্রাইসকে রেফারেন্স প্রাইস হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। এরপর ওএফএসের আওতায় বিক্রির প্রতিশ্রুত শেয়ার প্রথম লেনদেনের দিন থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে।
প্রথম লেনদেনের দিন প্রতিশ্রুত মোট শেয়ারের অন্তত ২৫ শতাংশ বিক্রি করতে হবে। অবশিষ্ট শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রির প্রস্তাব রয়েছে। এ সময় প্রতিশ্রুত শেয়ারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক-ইন বিধান থেকে অব্যাহতির কথাও বলা হয়েছে।
তালিকাভুক্তির তারিখ থেকে এক বছর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কোনো ওএফএস বিক্রেতা ওই কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবেন না। শেয়ার বিক্রির অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারকে প্রতিদিন স্টক এক্সচেঞ্জে প্রতিবেদন দিতে হবে। বিক্রির প্রতিশ্রুতি পূরণের পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্রোকারের বিস্তারিত প্রতিবেদন এবং সাত কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজারের যৌথ প্রতিবেদন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এ বিধান কার্যকর হলে বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া আরও সময়বদ্ধ হতে পারে। তবে তালিকাভুক্তির পর দ্রুত বড় পরিমাণ শেয়ার বাজারে আসার সম্ভাবনা শেয়ারের সরবরাহ ও দামের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বণ্টনে নতুন অনুপাত
আইপিওতে বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারীর জন্য শেয়ার বরাদ্দের অনুপাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্থির মূল্য পদ্ধতিতে প্রস্তাবিত বণ্টন—
• যোগ্য বিনিয়োগকারী: ১০ শতাংশ
• মিউচুয়াল ফান্ড: ১০ শতাংশ
• কোম্পানির স্থায়ী কর্মী: ৫ শতাংশ
• অনাবাসী বাংলাদেশি: ১০ শতাংশ
• সাধারণ বিনিয়োগকারী: ৬৫ শতাংশ
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রস্তাবিত বণ্টন—
• যোগ্য বিনিয়োগকারী: ৩৫ শতাংশ
• মিউচুয়াল ফান্ড: ১০ শতাংশ
• কোম্পানির স্থায়ী কর্মী: ৫ শতাংশ
• অনাবাসী বাংলাদেশি: ১০ শতাংশ
• সাধারণ বিনিয়োগকারী: ৪০ শতাংশ
মিউচুয়াল ফান্ড, স্থায়ী কর্মী ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নির্ধারিত অংশের শেয়ার অবিক্রীত থাকলে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশে স্থানান্তরের প্রস্তাব রয়েছে।
অতিরিক্ত আবেদন বা ওভারসাবস্ক্রিপশনের ক্ষেত্রে যোগ্য বিনিয়োগকারী, মিউচুয়াল ফান্ড ও স্থায়ী কর্মীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে শেয়ার বরাদ্দ করা হবে। অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এ লটারি স্টক এক্সচেঞ্জকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে হবে। লটারির অ্যালগরিদম ও কার্যপ্রণালি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে যাচাই করানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বরাদ্দের প্রতিটি ধাপের সময়ক্রমিক রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য অডিট ট্রেইল ব্যবস্থা রাখতে হবে।
স্বয়ংক্রিয় বরাদ্দ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে হাতে পরিচালিত প্রক্রিয়ায় অনিয়মের ঝুঁকি কমতে পারে। তবে বরাদ্দের সফটওয়্যার, তথ্যের নিরাপত্তা ও নিরীক্ষাযোগ্যতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আইপিওর অর্থ ব্যবহারে সীমা ও পৃথক ব্যাংক হিসাব
আইপিও বা রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুনরায় মূলধন সংগ্রহের (আরপিও) অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ দিয়ে কোম্পানির বিদ্যমান ঋণ বা বিনিয়োগ পরিশোধ করা যাবে। তবে সংশ্লিষ্ট ঋণ বা বিনিয়োগ কোম্পানির কোনো প্রকল্প অথবা ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে হবে। অর্থের ব্যবহার যথাযথ ছিল কি না, তা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
যে ঋণ পরিশোধ করা হবে, তা খেলাপি বা পুনঃতফসিল করা হলে চলবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ জমা দিয়ে ঋণের অবস্থা নিশ্চিত করার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
যৌথ উদ্যোগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোম্পানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জনসাধারণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ব্যবহারের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এ ধরনের বিনিয়োগের প্রকৃতি, প্রত্যাশিত সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ও আর্থিক অবস্থার বিবরণ প্রকাশ করতে হবে।
এ ছাড়া অর্থের সম্পূর্ণ ব্যবহার শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত ব্যবহার-প্রতিবেদন কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে।
জনসাধারণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ রাখার জন্য পৃথক এসক্রো ব্যাংক হিসাব খোলার প্রস্তাবও রয়েছে। ব্যাংককে লিখিত নির্দেশনা দিতে হবে, যাতে ওই হিসাবের অর্থ শুধু প্রসপেক্টাসে প্রকাশিত উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি অনুসারে ব্যবহার করা হয়।
এই বিধানগুলো কার্যকর হলে আইপিওর অর্থ ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অর্থ ছাড়, প্রকল্পভিত্তিক ব্যয় যাচাই এবং নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমার বিষয়গুলো কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
শেয়ার লক-ইনে পরিবর্তন, দ্রুত বিক্রির সুযোগ
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বরাদ্দ পাওয়া যোগ্য বিনিয়োগকারীদের শেয়ার লক-ইনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনেরপ্রস্তাব রয়েছে।খসড়া অনুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া যোগ্য বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের ৫০ শতাংশ প্রথম লেনদেনের দিন থেকেই বিক্রির জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাকি ২৫ শতাংশ ৬০ দিন এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ ৯০ দিনের জন্য লক-ইনে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের শেয়ার প্রথম লেনদেনের দিন থেকে দুই বছর লক-ইনে থাকবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের তারিখ থেকে তিন বছর অথবা তালিকাভুক্তির প্রথম লেনদেনের দিন থেকে দুই বছর—যেটি পরে শেষ হবে, সে সময় পর্যন্ত লক-ইন রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির শেয়ারের ক্ষেত্রে এক বছরের লক-ইনের মেয়াদ কমিয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাবও রয়েছে।লক-ইনের মেয়াদ ও অনুপাত পরিবর্তিত হলে বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়তে বা কমতে পারে। তাই এ ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নে কোম্পানির শেয়ারধারীদের ধরন, বিক্রিযোগ্য শেয়ারের পরিমাণ এবং বাজারের তারল্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইস্যু ম্যানেজার ও স্টক এক্সচেঞ্জের জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগআইপিও প্রক্রিয়ায় ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রয়োজনে ইস্যু ম্যানেজার অন্য মার্চেন্ট ব্যাংকার নিয়োগ করতে পারলেও পুরো পাবলিক অফারের চূড়ান্ত দায়িত্ব ও জবাবদিহি তার ওপরই থাকবে।আবেদন পাওয়ার ২০ দিনের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জকে কোম্পানির কারখানা, পরিচালনাস্থল বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং আর্থিক বিবরণী ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করতে হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জ প্রয়োজনে কোম্পানি, পরিচালক, কর্মকর্তা, নিরীক্ষক, ইস্যু ম্যানেজার, মূল্যায়নকারী, ব্যাংক, আন্ডাররাইটার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে অতিরিক্ত তথ্য, নথি, সনদ বা ব্যাখ্যা চাইতে পারবে।
প্রসপেক্টাসে কোম্পানির দায়বদ্ধতাও স্পষ্ট করতে হবে। যুক্তিসংগত অনুসন্ধান ও যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রকাশিত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে সত্য, ন্যায্য ও সঠিক—এ মর্মে কোম্পানিকে নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ, নাকি বাড়তি ঝুঁকি?প্রস্তাবিত সংশোধনীর ফলে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রচলিত মুনাফাভিত্তিক শর্তের বাইরে গিয়ে কোম্পানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।অন্যদিকে লোকসানি কোম্পানিকে ছাড় দেওয়া, উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সুযোগ এবং কিছু শ্রেণির বিনিয়োগকারীর শেয়ারে লক-ইন শিথিল করার মতো প্রস্তাব নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ মুনাফার পরিকল্পনা কাগজে আকর্ষণীয় দেখালেও বাস্তবে তা অর্জিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ কারণে বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে কোম্পানির আয়, নগদ প্রবাহ, ঋণের বোঝা, সম্পদের মান, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা যাচাই করা। পাশাপাশি মূল্যায়নে ব্যবহৃত অনুমান ও ঝুঁকির বিবরণও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বিএসইসির প্রস্তাবিত বিধিমালা এখনো সংশোধনের খসড়া। ফলে জনমত গ্রহণ ও পরবর্তী নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত বিধিমালায় শর্ত, অনুপাত বা সময়সীমায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই প্রস্তাবগুলোকে কার্যকর বিধান হিসেবে বিবেচনা করার আগে বিএসইসির চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
আইপিও নীতিমালার প্রস্তাবিত পরিবর্তন দেশের পুঁজিবাজারে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক তথ্য যাচাই, মূল্যায়ন পদ্ধতির স্বচ্ছতা এবং অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহি জোরদার করার একটি উদ্যোগ। তবে নতুন কোম্পানি বাজারে আসার সংখ্যা বাড়াই একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড হতে পারে না।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মান, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে এ সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা।
লোকসানি কোম্পানির জন্য সুযোগ তৈরি হলে সেই সুযোগ যেন দুর্বল বা অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানের দায় বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পথ না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে—নিয়ম কতটা কঠোর, যাচাই কতটা স্বাধীন এবং বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।


