অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম বৃহৎ অপারেটর রবি আজিয়াটা পিএলসি-এর সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক অবস্থার বিবরণী নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বিনিয়োগকারী মহলে। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ সমাপ্ত প্রান্তিকের সংক্ষিপ্ত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানির নগদ অর্থের অস্বাভাবিক পতন, স্বল্পমেয়াদি ঋণের হঠাৎ বৃদ্ধি এবং সম্পদের ধারাবাহিক সংকোচনকে ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে কিছু সূচক ইতিবাচক দেখালেও বাস্তব নগদ প্রবাহ ও দায় ব্যবস্থাপনার চিত্র বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্ক সংকেত বহন করছে।
তিনা মাসে নগদ অর্থ কমেছে প্রায় ১,৫৮০ কোটি টাকা
রবি আজিয়াটার আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানির Cash and Cash Equivalents ছিল প্রায় ২,৪২১ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৩৮ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ, এক প্রান্তিকেই কোম্পানির নগদ অবস্থান কমেছে প্রায় ১,৫৮০ কোটি টাকা।
প্রশ্ন উঠেছে—
এই বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে?
এটি কি পরিচালন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, নাকি অন্য কোনো আর্থিক চাপের প্রতিফলন?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, একটি বড় টেলিকম কোম্পানির ক্ষেত্রে নগদ অর্থের এমন দ্রুত পতন ভবিষ্যৎ তারল্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি ঋণে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে কোম্পানির Short Term Loans। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে যেখানে স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র প্রায় ২০ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকায়।
মাত্র তিন মাসে এমন ঋণ বৃদ্ধি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোম্পানি কি নগদ সংকট মোকাবেলায় জরুরি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নাকি পরিচালন ব্যয় সামাল দিতেই বাড়তি ঋণ নিতে হয়েছে?
সম্পদ কমছে ধারাবাহিকভাবে
প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানির মোট সম্পদ (Total Assets) কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকায়, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদের ধারাবাহিক সংকোচন ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সম্পদ কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
দায় এখনো বিপজ্জনক উচ্চতায়
রবি আজিয়াটার মোট দায় (Total Liabilities) এখনো প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
অন্যদিকে মোট ইকুইটি প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ, কোম্পানির আর্থিক কাঠামো এখনো উচ্চমাত্রায় দায়নির্ভর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ সুদহার ও বৈদেশিক মুদ্রা চাপের সময়ে এমন দায় কাঠামো ভবিষ্যতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
যদিও কোম্পানির Retained Earnings এবং NAV per Share সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন— শুধুমাত্র হিসাবভিত্তিক মুনাফা দিয়ে বাস্তব নগদ সংকট আড়াল করা যায় না।
কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে তার Cash Flow ও Liquidity Position।
আর সেখানেই এখন বড় প্রশ্নের মুখে রবি আজিয়াটা।
দেশের শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে রবি আজিয়াটা পিএলসি-এর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে আসা নগদ সংকট, ঋণ বৃদ্ধি এবং সম্পদ হ্রাসের বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা না এলে বাজারে আরও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য জানার জন্য কোম্পানি সেক্রেটারি শহিদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বলে জানানো হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বিষয়গুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখন সময়ের দাবি।
