
সাভার: ৫ আগস্ট ২০২৪; বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ও একই সাথে চরম নির্মমতার দিন। দুপুরের পর দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা যখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, তখন পুরো দেশ মেতেছিল বিজয়ের উল্লাসে। কিন্তু রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার এবং আশুলিয়ায় নেমে এসেছিল ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম ও নৃশংসতম অন্ধকার। সরকার পতনের খবর নিশ্চিত হওয়ার পরেও সাভার ও আশুলিয়া থানা পুলিশ এবং স্থানীয় তৎকালীন সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা ছাত্র-জনতার ওপর যুদ্ধক্ষেত্রের মতো নির্বিচারে স্নাইপার ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালায়। ৫ আগস্ট দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সাভার ও আশুলিয়াকে পরিণত করা হয় এক রক্তাক্ত ডেথ ভ্যালিতে।
গণহত্যার পটভূমি ও পতনোত্তর আক্রমণ
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই সাভার বাসস্ট্যান্ড, পাকিজা মোড়, বাইপাইল এবং আশুলিয়া থানা সংলগ্ন এলাকায় ছাত্র-জনতা জড়ো হতে থাকে। দুপুরের দিকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা আনন্দ মিছিল বের করে।
ঠিক সেই মুহূর্তে সাভারের পাকিজা ইউ-লুপ এবং আশুলিয়া থানার সামনে অবস্থান নেওয়া পুলিশ সদস্যরা কোনো উসকানি ছাড়াই আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে সরাসরি বুক ও মাথা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। পলায়নপর স্বৈরাচারের শেষ আক্রোশ যেন ভর করেছিল সাভার ও আশুলিয়া পুলিশের ওপর। বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এই নৃশংসতা।
লাশ পুড়িয়ে প্রমাণ লোপাটের বর্বরতা
এই গণহত্যার সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে আশুলিয়া থানার সামনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, আশুলিয়া থানার ওসি সায়েদ এবং এএসআই বিশ্বজিৎসহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা ৬ জন যুবকের মরদেহ ভ্যানে তুলে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যার প্রমাণ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা এবং বিষয়টিকে আন্দোলনকারীদের সহিংসতা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। এই ঘটনায় পরবর্তীতে ওসি সায়েদ, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী এবং ডিবির পরিদর্শক আরাফাত হোসেনসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
সাভার ও আশুলিয়ার কয়েকজন বীর শহীদদের তালিকা
৫ আগস্টের এই গণহত্যায় সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ এবং আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য মরদেহ আনা হয়। গণমাধ্যম ও স্থানীয় সুত্রে নিশ্চিত হওয়া কয়েকজন বীর শহীদের নাম ও পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:
| শহীদের নাম | বয়স/পরিচয় | মৃত্যুর স্থান/কারণ |
|---|---|---|
| রমজান আলী | ৩৫ বছর, আশুলিয়া | বুকের বাম পাশে গুলি লেগে সাভারে শহীদ হন। |
| তৌহিদুর রহমান | ২৮ বছর | পুলিশের গুলিতে সাভারে শহীদ হন। |
| মুজাহিদ | ২৪ বছর | সাভারে পুলিশের গুলিতে শহীদ। |
| রাসেল | ২৪ বছর | সাভারে পুলিশের গুলিতে শহীদ। |
| নাফিসা হোসেন | শিক্ষার্থী | সাভার পাকিজা মডেল মসজিদের সামনে বুকে গুলি লেগে শহীদ হন। |
| শ্রাবণ গাজী | ২১ বছর | ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সাভার নিউ মার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ। |
| জাহিদুল ইসলাম | ২৫ বছর | আশুলিয়া এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। |
| স্বপন প্রামাণিক | ২০ বছর | আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত ঘোষণা করা হয়। |
| রফিক | সাধারণ নাগরিক | সাভারে পুলিশের গুলিতে শহীদ। |
| নিশান | সাধারণ নাগরিক | সাভারে পুলিশের গুলিতে শহীদ। |
| শব্দ | সাধারণ নাগরিক | সাভারে পুলিশের গুলিতে শহীদ। |
| আব্দুল আহাদ সৈকত | শিক্ষার্থী/আন্দোলনকারী | সাভারের রাজপথে পুলিশের গুলিতে শহীদ। |
| মোহাম্মদ হৃদয় আহমেদ | আন্দোলনকারী | সাভার এলাকায় মাথায়/বুকে গুলি লেগে শহীদ হন। |
| আলামিন হোসেন | আন্দোলনকারী | সাভারে সংঘর্ষের সময় গুলিতে শহীদ। |
| মিঠু বিশ্বাস | সাধারণ নাগরিক | সাভারে নির্বিচার গুলিতে শহীদ। |
| মারুফ | আন্দোলনকারী | সাভার ও আশুলিয়া এলাকার সংঘর্ষে শহীদ। |
(উল্লেখ্য, এই তালিকায় থাকা নামের বাইরেও আশুলিয়ায় ভ্যানে পুড়িয়ে দেওয়া অজ্ঞাতনামা শহীদ এবং বিভিন্ন হাসপাতালে আনা আরও বহু লাশের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, যাদেরকে স্থানীয়রা পরবর্তীতে বিভিন্ন কবরস্থানে দাফন করেন।)
৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সাভার ও আশুলিয়ায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (Extrajudicial Killing) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরমতম লঙ্ঘন (Gross Violation of Human Rights)। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে এবং পতনোত্তর সময়ে সাধারণ নিরস্ত্র নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এই মরিয়া ও নিষ্ঠুর আক্রমণ বিশ্ব বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এই গণহত্যার ক্ষতিকর দিক ও বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জীবনের মৌলিক অধিকার হরণ (Right to Life)
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর অনুচ্ছেদ ৩ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (ICCPR)-এর অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী—প্রত্যেক মানুষের বেঁচে থাকার জন্মগত অধিকার রয়েছে এবং আইনসম্মত বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে তার জীবন থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সাভার ও আশুলিয়ায় পুলিশ কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, কোনো সতর্কতা না দিয়ে সরাসরি ছাত্র-জনতার বুক ও মাথায় স্নাইপার ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করেছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের চোখে একটি জঘন্য অপরাধ।
২. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল দায়িত্ব নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু ৫ আগস্ট সাভার-আশুলিয়ায় পুলিশ নিজেই ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। কোনো স্বাধীন দেশে আদালত বা আইনি প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে এভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষকে হত্যা করা আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা স্বৈরাচার রক্ষায় জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
৩. মৃতদেহের বিকৃতি ও মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা
আশুলিয়া থানার সামনে নিহতদের মরদেহ ভ্যানে স্তূপ করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, জীবিত মানুষের পাশাপাশি একজন মৃত মানুষের মরদেহেরও ন্যূনতম সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
- লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার এই পাশবিক চেষ্টা শুধু প্রমাণ লোপাট ছিল না, এটি ছিল নিহতদের পরিবারকে তাদের প্রিয়জনের শেষ বিদায় জানানোর এবং ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী দাফন করার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ভাষায় ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট লক্ষণ।
৪. ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বাধা ও ভয়ের সংস্কৃতি
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম বড় প্রভাব হলো এটি সমাজে একটি তীব্র ভয়ের সংস্কৃতি (Culture of Fear) তৈরি করে। সাভার-আশুলিয়ায় যেভাবে সাধারণ পথচারী ও শিক্ষার্থীদের গুলি করা হয়েছে, তা নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার—যেমন স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও মত প্রকাশের অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করে। এছাড়া লাশ পুড়িয়ে ফেলার কারণে অনেক শহীদের পরিচয় আজ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি, যা তাদের পরিবারের জন্য আজীবন এক নির্মম মানসিক যন্ত্রণা (Mental Torture) এবং আইনি বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।
