
সাভার ও এর আশেপাশের এলাকায় অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় জলবায়ুতে মারাত্মক নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তীব্র হচ্ছে ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব
সাভার এখন আর কোনো সাধারণ শহরতলী নয়, এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। অপরিকল্পিতভাবে ফসলি জমি ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে একের পর এক পোশাক কারখানা, ট্যানারি শিল্প ও ভারী কলকারখানা। এসব কারখানার বর্জ্য এবং অপরিশোধিত ধোঁয়া বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবুজ গাছপালা ও উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় সাভার এলাকাটি একটি ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে। ফলে আশেপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় সাভারের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেশি অনুভূত হচ্ছে।

ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কসহ সাভারের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন বাস, লেগুনা ও ড্রাম ট্রাক চলাচল করছে। এসব যানবাহন থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়া (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা PM ২.৫) সরাসরি বাতাসে মিশছে। এই বিষাক্ত কণাগুলো সূর্যের তাপকে বায়ুমণ্ডলে আটকে রাখে, যা স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করছে। তীব্র যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইঞ্জিন চালু থাকায় এই তাপ ও দূষণের মাত্রা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্থানীয় প্রভাব
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সাভারে এখন ঋতুচক্রের স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে পড়েছে। বর্ষাকালে সঠিক সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে না, আবার যখন হচ্ছে তখন তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর নিচে নেমে যাচ্ছে, যার ফলে তীব্র পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।
ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য
বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বাতাসে বিষাক্ত গ্যাসের মিশ্রণের ফলে সাভারের সাধারণ মানুষের মাঝে নানাবিধ রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পোশাক শ্রমিক, রিকশাচালক এবং শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন শ্বাসকষ্ট, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা, চর্মরোগ এবং হিট স্ট্রোকের রোগী আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও করণীয়
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাভারকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে নিচের উদ্যোগগুলো নেওয়া প্রয়োজন:
- ইটিপি ও স্ক্রাবার ব্যবহার: প্রতিটি শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলকভাবে বর্জ্য শোধনাগার (ETP) এবং ধোঁয়া নিয়ন্ত্রক স্ক্রাবার ব্যবহার নিশ্চিত করা।
- ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ: মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ক থেকে কালো ধোঁয়া নির্গতকারী ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
- সবুজায়ন ও জলাশয় রক্ষা: কারখানার আশেপাশে বাধ্যতামূলক সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা জলাশয়গুলো দখলমুক্ত করা।
- আইনের কঠোর প্রয়োগ: পরিবেশ দূষণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ আদালতের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
সাভারকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন ও শিল্প মালিকদের যৌথ উদ্যোগই কেবল পারে সাভারের এই জলবায়ু বিপর্যয় রোধ করতে।
